মঙ্গলবার, ৩ মার্চ, ২০০৯

হুলোর হুলিগ্যানিজম............

সেদিন লীলা মজুমদারের ‘পাকদণ্ডী’ পড়ছিলাম। গল্পের প্রায় শেষদিকে উনি নেপোর গল্প শুনিয়েছেন। সেটা পড়ে ভারি মজা লাগল আর আমার বেশ কিছু পুরনো কথা হুড়মুড় করে মনে পড়ে গেল। মনের কোণেই সেগুলো সব ছিল তবে একটু আবছা হয়ে গেছিল হয়তো। তা আবছা তো হবেই, আজ থেকে প্রায় বছর তেরো আগেকার কথা তো বটেই। তারপর অনেক দিন হয়ে গেছে, আমিও আপাতত কলকাতার বাইরে, আর সব চেয়ে বড় কথা হল যাদের নিয়ে স্মৃতি তাদের দেখাই পাওয়া দায় ব্যাঙ্গালোরে। দেখা পেলে না হয় তবু মনে থাকত। যাক গে, আসল কথায় আসি। তা এই নেপো টা কে? সেইটা আগে বলা দরকার। যারাই বইটা পড়েছেন তারাই জানেন যে নেপোলিয়ন ওরফে নেপো ছিল লেখিকার সাধের পোষা বেড়াল! তার কীর্তিকলাপ উনি সরস ভাবে স্মৃতিচারণ করেছেন বইয়েতে।

এবার একটু পেছনে তাকানো যাক। আমরা তখন পাইকপাড়ায় থাকি। উত্তর কলকাতায় যেমন হয় আর কি, পাশাপাশি বাড়ি সব। এতটাই নৈকট্য যে বেশী জোরে কথা কইলে পাশের বাড়িতেও শোনা যেত!! তবে সেই দুকামরার দুনিয়ায় যে কত আনন্দে দিন কেটেছে তার কোনও হিসাব নেই। আমাদের বাড়ির দুদিকের দুটি বাড়িতে দুই বসু পরিবার থাকতেন। আমাদের সাথে নিবীড় আত্মীয়তা ছিল। প্রতিদিন বিকেলে মা কাকীমারা উঠোন এ দাঁড়িয়ে নয়তো ঘরের জানলা দিয়ে গল্প করতেন। সংসারের রোজনামচা থেকে শুরু করে সিনেমা, ধারাবাহিক, অসুখ বিসুখ, কার টবের গাছে কি ফুল ফুটল আবার পরশু মা যে জবা ফুলটা কাকীমাকে দিয়েছিল সেটা এখনও তাজা আছে মায় কালকে ওবাড়ি থেকে যে কড়াইশুটির কচুরি এসেছিল তার অপূর্ব স্বাদের বিষয় ও বাদ যেত না। তা আমাদের প্রতিবেশী দুই পরিবারেই বেশ কিছু পোষ্য ছিল। আমাদের ডানদিকের বাড়িটিতে বেড়াল, দুটি কুকুর, প্রচুর পাখি, খরগোশ আর বিশাল তিনটে আ্যাকোয়ারিয়াম ভর্তি হরেক রঙের মাছ। তাদের বাহারে ঘরটা ঝলমল করত। আর বাঁদিকের বসুদের ছিল কুকুর। এই বাড়ির ছোট্টো মেয়ে গিণি সেই কুকুর নিয়ে খেলা করত। ককুরটা ছিল তার প্রাণের সঙ্গী। একদিন স্কুল থেকে ফিরে শুনি মা কাকীমাদের মধ্যে জোর আলোচনা চলছে। তখন খেলতে যাওয়ার তাড়া তাই কান না দিয়ে আমি দিলাম ছুট। সন্ধ্যেবেলা ফিরে দেখি হইহই ব্যাপার। কি না, এক নয়া পোষ্যের আবির্ভাব হয়েছে গিণিদের বাড়িতে। আমারও বেশ কৌতুহল হল। দৌড়ে গেলাম গিণিদের বাড়ি। দরজা খুলেই কাকীমা বললেন ‘দেক দিকিনি, আজ ইস্কুল থেকে কি নিয়ে এসেচে’! একটু এগিয়ে দেখি, গিণি কি একটা নিয়ে খেলা করছে। কাছে গেলাম, ও মা এ যে দেখি বেড়াল ছানা! কিন্তু ওরকম বেড়াল ছানা তার আগে আমি দেখিনি। টকটক করছে গায়ের রঙ, ঠিক আমাদের জাতীয় পতাকার গেরুয়ার ওপর এক পোঁচ খয়েরি মেশালে যা হয় তাই। চোখ দুটো অস্বাভাবিক রকম ঊজ্জ্বল, তাই দিয়ে একটা বিরক্তি মিশ্রিত চাহনি দেখা যাচ্ছে। এরপর দেখি ল্যাজ, সে কি গঠন! ওইটুকু বেড়ালছানার ওরকম ল্যাজ আমাদের তল্লাটে আমি কস্মিনকালেও দেখিনি। সেই দুর্গাপুজোর ঢাকের মাথায় যেরকম একটা ঝামর থাকে ঠিক তেমন, আর সবথেকে মজার ব্যাপার হল ল্যাজটি সর্বক্ষণ অ্যাটেনসন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে!! প্রথম দর্শনেই যা দেখলাম তাতে তো চোখ কপালে উঠল।গিণি বেশ গর্ব ভরে বলল তার ইস্কুলে নাকি ছানাটার জন্ম। দিদিমণিরা যেই না জিজ্ঞেস করেছেন কে সেটা নিতে চায় গিণি আর দেরী করেনি। তার কিনা অনেকদিনের শখ একটা হুলো পোষার! একটু মাথায় হাত বোলাবার জন্য যেই না এগিয়েছি, সে দেখি ফ্যাঁচ করে থাবাটা বাড়িয়ে খামচাতে আসে। তা যাই হোক বেশ খানিক কসরত করে তো তার মাথায় হাত দিলাম কিন্তু হাবেভাবে দিব্যি বোঝা গেল সে অন্য বেড়ালদের থেকে স্বতন্ত্র। ফেরার আগে জিজ্ঞেস করলাম ‘ওটার নাম কী রাখবি রে?’ তা সেটা তখনও ঠিক হয়নি। গল্পগাছা করে তো বাড়ি এসে বেশ রসিয়ে গল্প করলাম আমাদের বাড়ির লোকজন এর কাছে। আমাদের পাইকপাড়ার বাড়ির লোকজন বলতে অন্যান্য ভাড়াটেরাও বটে। সকলেই বেশ অবাক।

কদিন পরের কথা হবে, জানলা দিয়ে কাকীমা খবর দিলেন, নামকরণ হয়েছে। অনেক ভেবেচিন্তে ছানাটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘মিনু’। সকলেই বলল সেকি? শুনলাম, হুলো, তার নাম মিনু হয় কী করে? একগাল হেসে জবাব এল, ‘না, ওইটা কী না ডাকনাম, ভালো নাম থেকে ছোট করে দেওয়া হয়েছে’। বোঝ কান্ড!! বেড়ালের আবার নামের এদিক ওদিক!! তা ভালো নাম টা কী? না ও কী না বেশ ভাল জাতের বেড়াল, তায় কাবুলী বলে কথা, তার ওপর গিণি ইস্কুল থেকে নিয়ে এসেছে আর দিদিমণিরা বার বার বলে দিয়েছেন বেশ যত্ন আত্তি করতে। আর তাছাড়া ও বেড়াল তো কি হল, পরিবারের একজনই তো হয়ে গেছে। এই সব বিবেচনা করে ওর নাম দেওয়া হয়েছে ‘মৈনাক’ আর ছোট করে ‘মিনু’!!

সেইদিন থেকে বসু পরিবারে মেম্বর বেড়ে গেল আর আমরাও জানলার গরাদের ওপারে দেখলেই, মৈনাক বোস! মৈনাক বোস! বলে ডাকাডাকি করতাম। এইভাবে, দিন যাচ্ছে, মিনু আস্তে আস্তে বড় হয়। তখনও সে বাড়ির বাইরে পা রাখেনি। আমরা শুধু মাঝে মাঝে তার ডাক শুনি। বেশ গুরুগম্ভীর সে ডাক, আমাদের বাঙ্গালী বেড়ালের মত মিউ মিউ না।
এরপর এল সেই বিশেষ দিন। মনে পড়ছে, শীতকাল ছিল, আর দুপুরবেলা। মা বোধহয় উঠোনে ছিল, আরও সব ছিল বোধহয় অনেকে। আমার খুব সম্ভবত স্কুলের ভেকেশন চলছিল। আচমকা, হইচই, ‘ওরে পড়ে যাবে রে, ধর ধর। ওদের বাড়ির লোক কে ডাক, সব গেল কোথায়’... এই সব ব্যাপার। বেরিয়ে দেখি বসু বাড়ির দোতলার রান্নাঘরের ছোট্ট জানলা দিয়ে মিনু মুখ বের করে দাঁড়িয়ে আছে। মিনু যে আর ছোট্টটি নেই সেটা কারও খেয়ালই নেই! অথচ ততদিনে মিনু শিশু থেকে বয়োঃপ্রাপ্ত হয়েছে, তার সেই কাবুলি ল্যাজ পরিপুষ্ট আকার ধারণ করেছে, চোখ দুটো ভাঁটার মত জ্বলজ্বল করে, ঝাঁটার মত গোঁফ গজিয়েছে যা কিনা ব্যক্তিত্বের সাথে বেশ খাপ খেয়ে গেছে। মিনু আত্মপ্রকাশের জন্যে তৈরি, শুধু শুভক্ষণের অপেক্ষা। তা, আমার মনে হল সেই সময় বোধহয় এসে গেছে। সেই দুপুরে ওই চেঁচামেচীর মধ্যে ক্রমশ মিনু নিজের শরীরটা গরাদের মাঝে গুটিয়ে নিল, সমস্ত মাংসপেশী শক্ত হয়ে এল, আর তারপর সম্মুখস্থ জনতার সামনে দিয়ে সেই চীরউল্লম্ব ল্যাজ তুলে দিল এক লাফ! গন্তব্য পাশের বাড়ির একতলার আ্যাসবেস্টসের চাল। দূরত্বটা আন্দাজ ১০-১২ ফুট হবে। সেকেন্ডের ভগ্নাংশের তফাত হবে, মিনু সগৌরবে চালের ওপর ল্যান্ড করল। এক গাঝাড়া দিয়ে সে সদর্পে হুঙ্কার দিল। সে কী ভীষণ বজ্রনির্ঘোষ। তারপর তাচ্ছ্বিল্যের সাথে আমাদের দিকে তাকিয়ে পেছনের আমগাছের আড়ালে অন্তর্হিত হল।

এইভাবে, মিনু বাড়ির বার হল। ক্রমে সে আশপাশের বাড়ির পাঁচীল ছেড়ে দূরে দূরে যেতে থাকে। মাঝে মাঝে তাকে দেখি পাড়ার বাইরে বেশ খানিক দূরে হয়তো ঘুরঘুর করছে। মিনুর কীর্তিকলাপের তখনও অনেক কিছুই অবশ্য বাকি ছিল। এক সকালে শুনি কাকীমা বেশ দুঃখের সাথে মাকে কিছু বলছেন। ‘কাল সন্ধ্যে থেকে মিনু কে খুঁজে পাচ্ছি না দিদি, কোথায় যে গেল, অন্যদিন ঠিক রাতের খাবার সময় হাজির হয়ে যায়, কাল কত করে ডাকলাম...’ তা মা খানিক স্তোকবাক্য দিয়ে সান্ত্বনা দিল মনে হয়। সেদিন গেল, পরের দিন গেল, তার পরের দিনও মিনুর দেখা মিলল না। বসু পরিবার তো শোকে মুহ্যমান। সকলেই বলাবলি করছে, বেচারা বোধহয় ভুল করে রাস্তা পার হতে গিয়ে চাপা পড়েছে। কিন্তু তা হলেও পাড়ার মধ্যে কিছু হলে খবর একটা আসতই। এবার তা যখন হয়নি তাহলে একটা ক্ষীণ আশা আছে, হয়তো কেউ ভাল জাতের বেড়াল ভেবে চুরি করে নিয়ে গেছে, ক'দিন পরেই ফেরত দেবে। দিন যায়, কিন্তু কাকস্য পরিবেদনা, মিনুর কোনও হদিস নেই। ঠিক সাতদিনের মাথায় আবার চমক। এবার আমার মায়ের চোখেই পড়ল। ভোরবেলা, মা উঠে বোধহয় গাছে জলটল দিচ্ছিল। এমন সময় দেখে পাঁচীলের ওপর গুটিসুটি মেরে ওটা কে রে? ও মা এ যে মিনু! সঙ্গে সঙ্গে হাঁক ডাক শুরু হয়ে গেল। আমার ঘুমটা গেল চটকে। বেরিয়ে দেখি, মিনু নির্জীবের মতন পড়ে আছে। সারা মুখে কালিঝুলি, গায়ের সেই সোনার মতন রং ধূলিধূসর। এতটাই দুর্বল যে উঠে দাঁড়াতেই পারছে না। গিণির বাবা ব্যস্ত হয়ে নেমে এসে পরম স্নেহে কোলে করে মিনু কে নিয়ে গেলেন। ব্যাপার বুঝতে কারও বাকি রইল না। মিনু নির্ঘাত কোনও সুন্দরীর মোহে আচ্ছন্ন হয়ে তার পশ্চাদ্ধাবন করে বেপাড়ায় গিয়ে হাজির হয়েছিল তারপর পথ হারিয়ে এই কদিন বিভিন্ন পাড়ার মাস্তানদের হাতে পিটুনি খেয়ে অবশেষে আবার বাড়ি ফিরেছে। স্কুল যাবার সময় শুনলাম, গিণি আদর করে মিনু কে ধমকাচ্ছে ‘ আবার যদি তুই পাড়ার বাইরে গেছিস তো ঠ্যাং ভেঙ্গে দেব...’ তার উত্তরে মিনু অবশ্য কি জবাব দিল সেটা মনে নেই!

কদিনের সেবা যত্নেই মিনু পুরোনও জ়েল্লা ফিরে পেল। তবে এবার সে সাবধানী। পাড়ার মধ্যেই ঘুরে বেড়ায় আর প্রবল ম্যাঁও ম্যাঁও শব্দে লোকের দুপুরের ঘুম নষ্ট করে। এই অবধি ঠিক ছিল কিন্তু এরপর ঘটনাচক্রে মিনুর এক প্রতিদ্বন্দ্বী হাজির হল। সেই কথা বলি এবার। আমাদের অন্যপাশের বসু পরিবারও পশুপ্রেমে পিছিয়ে ছিলেন না সেটা আগেই বলেছি। এবার শুনলাম তারা চল্লিশ বছরের বাস উঠিয়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছেন। একটু দুঃখ হল কারণ ওবাড়ির সাথেও আমাদের ভারি হৃদ্যতা ছিল। তা ওবাড়িতেও কুকুর, খরগোশ, পাখি মাছের সাথে একটি বেড়াল পরমানন্দে থাকত। এতই আরামের জীবন ছিল তার যে আমরা পারতপক্ষে তাকে দেখতাম না। ও বাড়ির লোকজন তার নাম দিয়েছিল ‘সায়েব’। সায়েব ছিল ধপধপে ফরসা, মাথার কাছে একটু হাল্কা ছাই ছাই ছোপ আর ল্যাজটা ছাইয়ে কালোয় মেশানো। চোখ দুটো ছিল পারফেক্ট ক্যাট’স আই যাকে বলে, ঊজ্জ্বল গাঢ় সবুজ আর তার মধ্যে মিশমিশে কালো চোখের তারা। তবে সায়েবের স্বভাবটা সত্যি সাহেবি ছিল। শান্ত, ধীর, স্থির সায়েব অকারণে ডাকাডাকি করত না, কখনও কারও সাথে মারপিট করত না। চুপচাপ ছাতের আলসেতে লম্বা হয়ে ল্যাজটা ঝুলিয়ে দিয়ে চোখ বুজ়ে শীতকালের মিঠেকড়া রোদ পোয়াত।

যাবার দিন এল, বসুরা লটবহর আর তাদের পোষ্য নিয়ে চলে গেলেন কিন্তু সেই হট্টগোলের মধ্যে সায়েব কে নিয়ে যাওয়ার কথা কারও মনে ছিল না। অনেক রাত্রে আমাদের বাড়ির দরজার সামনে দেখি সায়েব বসে আছে। মুখের দিকে তাকিয়ে বোঝা যায় সারাদিন কিছুই পেটে পড়েনি উল্টে মারধরও পড়েছে হয়ত। সায়েবের অবস্থা তখন উদ্বাস্তুর মত। একদিনের নোটিসে তার এতদিনের সুখের আশ্রয় মাথার ওপর থেকে সরে গেছে। যে কিনা কোনওদিন রাস্তার বেড়ালের মতন খাবার খুঁজে খেত না আজ তাকে পেটের তাগিদে বাড়ি বাড়ি ঘুরতে হচ্ছে। একসময় যে শুধু পোলয়া কালিয়া খেত আজ তার কপালে শুধুই উচ্ছিষ্ট বরাদ্দ। তা যাই হোক, মা তো সায়েব কে দেখেই বেশ বাবা বাছা করে তার যথাবিহিত সেবার ব্যবস্থা করলেন। সায়েবও নিবিষ্ট মনে দুধভাত খেয়ে গুটিগুটি তার পুরোন আস্তানায় চলে গেল।

সেই রাতে সেই যে সায়েব আমাদের বাড়ি এসে সেবা পেল, এরপর একাদিক্রমে প্রায় পাঁচ বছর সায়েব আমাদের সঙ্গ দিয়েছে। আমৃত্যু তার স্বভাবটা একই রকম ছিল।
যা বলছিলাম, সায়েব তো আমাদের বাড়ির বাসিন্দা হয়ে গেল। তবে সায়েবের রুটিন টা বেশ সাহেবি ছিল। রাতে সে আমাদের বাড়ি থাকত না। ভোর পাঁচটায় মা উঠে যখন দরজা খুলত ঠিক সেই সময় সায়েব গুটিগুটি নাইট ডিউটি থেকে ফিরে দরজার কাছে বসে থাকত। সকালে তার পছন্দ ছিল শুধু দুধ। ওই দুধটুকু খেয়ে সে আয়েস করে আমার ঘরের দরজ়ার পাপোশের ওপর দিব্যি টানটান হয়ে ঘুমোত। আমি চিরকালের রাতজাগা, তাই বছরে মহালয়া, সরস্বতী পুজো আর নববর্ষ ছাড়া কদাচ ভোর দেখতাম। বাবা অফিস চলে যাওয়া অবধি সে ওইখানেই ঘুমোত। তারপর আমি উঠলে পর আমার কাছে এসে একটু আদর খেত। সবুজ চোখ নিয়ে চুপচাপ তাকিয়ে থাকত। কি আদর, কি খাবার, কোনও কিছু নিয়েই সায়েবের আদেখলেপনা ছিল না। খিদে পেলে সোজা একবার মায়ের কাছে যেত আর রান্নাঘরের বাইরে চুপটি করে দাঁড়িয়ে থাকত। মা হয়ত দেখতে পেল না তখন একটিবার ডেকে নিজের অস্তিত্ব জানান দিত। এবার তারপরেও যদি মনোযোগ দেওয়া না হত তাহলে চুপচাপ চলে যেত। এখন একে আভিজাত্যপূর্ণ ব্যবহার না বলে তো পারি না।

এইভাবেই দিন যায়, ওদিকে মিনু এদিকে সায়েব নিজের মতই থাকে। সমস্যা শুরু হল ক’মাস পর। বেড়ালরা এমনিতেই বিশেষ আরামপ্রিয়। সারা গ্রীস্মকালটা দুপুরবেলা সায়েব আমাদের একতলার ঠাণ্ডা ঘরে দিব্যি দিবানিদ্রা দিত। এইরকম এক দুপুরে শুরু হল দুই যুযুধান হুলোর লড়াই। সারা পাড়া কাঁপিয়ে, আঁচড়ে কামড়ে রক্তারক্তি কাণ্ড। কিছুতেই তাদের আলাদা করা যায় না। যুদ্ধ যখন শেষ হল, তখন মিনুর একটা কান কেটে ফালাফালা আর সায়েব সামনের পায়ে খোঁড়াচ্ছে। ওষুধ ইত্যাদি তো দেওয়া হল। তখনকার মত তো শান্তি কিন্তু বেশ বুঝলাম এই সবে শুরু। তারপর থেকে সায়েব-মিনু সংঘাত নিত্যদিনের ব্যাপার দাঁড়াল আর আমরাও অভ্যস্ত হয়ে পড়লাম। মাঝে মাঝেই থাবাটা, কানটা, ল্যাজটা ক্ষতবিক্ষত করে এসে দাঁড়াত আর মারকিউরোক্রোমে রঙ্গিন হয়ে আবার বেরিয়ে যেত।

কেটে গেল প্রায় চার বছর। মিনু আর সায়েব আস্তে আস্তে বুড়ো হয়েছে। তাদের শারীরীক তেজ কমে এসেছে কিন্তু আস্ফালনের বহর একই রকম রয়েছে। পাঁচীলে মুখোমুখি হলেই ব্যাস! শুরু হয়ে যায় ল্যাজ তুলে আক্রমণ আর প্রতিআক্রমণ। তবে আগের মত এখন আর বেশীক্ষণ চলে না মারদাঙ্গা। খানিক পরেই দুজনেই নিজের পথ দেখে। ইতোমধ্যে মিনু এবং সায়েব যথারীতি তাদের সাংসারিক কর্তব্য সম্পাদন করেছে এবং বেশ কয়েক গণ্ডা মার্জার শিশুকে পিতৃত্ব দান করেছে। সুতরাং জীবিতকালে মোটামুটি যা যা কর্তব্য সবই হয়ে গেছে এইবার বাণপ্রস্থে গেলেই স্বর্গলাভ নিশ্চিত!

অচিরেই সেই দিনও এসে গেল। কিন্তু সায়েবের শেষটা যে এত বেদনাদায়ক হবে সেটা ভাবিনি। কদিন ধরেই সায়েব বেপাত্তা। আমরা অবশ্য ভেবেছিলাম যেমন অন্যবার হয় এবারও সেরকম ক'দিন পরে আপনি ফিরবে। তা এল অবশ্য ফিরে কিন্তু সেই শেষবারের মতন। বোধহয় কোনও কুকুরের পাল্লায় পড়েছিল যে কিনা মাথায় কামড়ে দিয়েছিল। যখন টলতে টলতে আমাদের দরজার সামনে এসে সেই গভীর সবুজ চোখে মায়ের দিকে করুণ ভাবে তাকাল তখন আর কিছুই করার নেই। মনে আছে, আস্তে আস্তে একটা বাটিতে করে একটু দুধ সায়েবের মুখের কাছে ধরেছিলাম। আমার দিকে খানিক তাকিয়ে থেকে তারপর সেটা খেয়েছিল, তারপর চলে গিয়েছিল। সেই বিকেলে আমাদের বাড়ির বড় লোহার গেট থেকে শেষবারের মতন চলে গেল, আর ফিরে এল না। একটা কথা আছে, বেড়াল নাকি তার মৃত্যু আসন্ন বুঝলে কোনও অচেনা জায়গায় যায়। কথাটা সায়েবের চলে যাবার পর বিশ্বাস করেছিলাম।

এরপর মিনু আরও বছরখানেক কি তার সামান্য বেশি বেঁচেছিল। বসুবাড়িতে ততদিনে অন্য পোষ্য এসেছে তাই মিনুর আর সে কদর নেই। তার সেই কন্দর্পকান্তি অস্তপ্রায়, গায়ের লোম ঝরে গিয়ে বার্ধক্য প্রকট হয়ে পড়েছে কিন্তু কাবুলী তেজে সে তখনো একমেবদ্বিত্বীয়ম, পাড়ার অবিসংবাদী মাস্তান হুলো। যতদূর মনে পড়ে মিনুও একদিন নিরুদ্দেশ হয়ে গেল আর ফিরে এল না। কিছুদিনের মধ্যে বসুরাও বাড়ি বিক্রী করে চলে গেলেন।

তার পরেও আমাদের বাড়িতে অন্য বেড়াল ছিল কিন্তু সায়েব তার জায়গায় অমলিন। আজ এতদিন পর আবার ফিরে গেলাম সেই উমাকান্ত সেনের লেনের বাড়িতে, সেই চেনা বাড়ির কাছের মানুষগুলোর সাথে আবার দেখা হল আর একটা কথা উপলব্ধি করলাম......কি সুখ কি দুঃখ...স্মৃতি আসলে সততই সুখের।